যাঁকে ঘিরে আমার অস্তিত্ব ...

যাঁকে ঘিরে আমার অস্তিত্ব ...


মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য : সত্তার সমন্বয়




বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ সাংস্কৃতিক সমন্বয় ও ধর্মীয় গণচেতনার যুগ। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতেই বাংলাদেশে যে মুসলমান শাসনকাল শুরু হয় তা স্থায়ী হয় প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরবহিরাগত এই শাসন ব্যবস্থা ও ধর্মীয় সামাজিক ক্রিয়াকান্ডের সঙ্গে বাঙালির এই নতুন পরিচয় স্বাভাবিক ভাবেই তার জীবন , সাহিত্য , সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চার উপর প্রভাব ফেলেছিল । বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে তখন শুরু হয় ধর্মান্তরীকরণ প্রক্রিয়া । যদিও ধর্মান্তরের সংগে সংগেই উত্তরাধিকার সূত্রে লব্ধ হিন্দু ঐতিয্য ও সংস্কারের প্রভাব থেকে এই দেশীয় মুসলমানদের তখনও মুক্তি ঘটেনি । মনে রাখতে হবে তিতুমীরের আবির্ভাব বা ওয়াহাবি আন্দোলন তখনও শুরু হয়নি । এক্ষেত্রে অনেকেই বিদেশি ভাষাজ্ঞানের অভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে থাকলেও সেই যুক্তিও কতখানি গ্রহণযোগ্য তা আলোচনার বিষয় । মূলত শরিয়তী বিধানের প্রতি একটা অবহেলার ভাব তখন ধর্মান্তরিতদের মধ্যে কার্যকরী ছিল ।শাসকবর্গের নানাবিধ প্রচেষ্টাও এই দেশীয় মুসলমান সমাজকে নৈষ্টিক মুসলমানরূপে গড়ে তুলতে পারেনি । এছাড়া আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে একই জায়গায় অবস্থানের ফলে তাদের যৌথ সংস্কৃতিরই দ্বারস্থ হতে হয়েছিল । নবদীক্ষিত মুসলমানেরা যথার্থভা্বে মুসলমান হয়ে উঠতে পারেনি বলেই তাদের আচরিত ধর্মকে একালের অনেক পণ্ডিতেরা লৌকিক ইসলাম বলে আখ্যায়িত করেছেন । বিভিন্ন তথ্যসূত্রে এও জানা যায় যে দেশীয় মুসলমানেরা খোদারসুলের নাম ছেড়ে রামায়ন মহাভারত পাঁচালির আসরে ভীড় জমাতেনউনিশ শতকের প্রথমার্ধে মুসলমান সমাজের ধর্মসংস্কার আন্দোলনের সময় পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানেরা হিন্দুদের দুর্গাপূজা, কৃষ্ণ ও শীতলার উপাসনায় অংশগ্রহণ করতেনসন্তান-সন্ততির বিয়ের দিন ধার্য করতে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের পরামর্শ নেওয়া অথবা শিব-পার্বতী ও লক্ষীকে নিয়ে ধর্ম সংগীত -মনসার ভাসান গান রচনা , নানাবিধ ক্রিয়াকান্ডে হিন্দু সংস্কার পালন এসব কিছুই সেসময়ে নবদীক্ষিত মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত ছিলহিন্দুদের মতোই ভাগ্য গণনা বা শুভকাজে জ্যোতিষির (নাজুমি বা নায়ুমি )শরণাপন্ন হতে সাধারণ থেকে মোগল শাসকদের পর্যন্ত দেখা যায় । ভূতপ্রেতের ভয় এবং এদের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে নানাধরণের ডাইনিবিদ্যা ও ইন্দ্রজালের প্রতি আকর্ষণ সেকাল থেকে আজ অব্দি সাধারণ মানুষের মধ্যে বর্তমান । অম্বুবাচীর দিনে হালচাষ বন্ধ রাখা , না-পাক চীজ গোবর দিয়ে অঙ্গন-প্রাঙ্গন পরিষ্কার রাখা, প্রিয়জনের মৃত্যুর পর তিতাভক্ষণ , প্রতীক পূজার প্রভাবে আওরার দিনে হাসান-হোসেনের মূর্তি নির্মাণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন হিন্দু প্রভাবে এসব রীতিনীতি মুসলমান সমাজে প্রবলভাবে অনুসৃত হত :
শুনিয়াছি কাফের মুখে কেহ যদি মরে ।
তাহারে দহিয়া যদি ফিরি আইসে ঘরে।।
তিতা ভক্ষি লোহা দেওন্ত ভান্ডে করি সেনান ।
যুগ পদতলে যত্নে রাখন্ত পাষাণ ।।
সে সবের দেখাদেখি মুসলমানগণ
তিতা অন্ন ভক্ষ্য করে কিসের কারণ ।।
** ** **
মৃত ঘরে তিতা অন্ন দিতে অনুচিত ।
মধু মিঠা ঘৃত লনী খাইতে উচিত ।। (শরীয়তনামা : নসরুল্লাহ খোন্দকার)
হিন্দুদের মত মুসলমানরাও বিধবা রমণীকে বিয়ে করতেন না । এমণকি বাগদত্ত পুরুষের মৃত্যু হলে বাগদত্তা নারীকে বিধবা রমণীর নিয়মকানুন পালন করতে হত । কাঁচের চুড়ি , সোণার অলংকার , জমকালো পোশাক পরিধান করা এসব কিছুই এই রমণীদের পক্ষে রীতিবিরুদ্ধ ছিল ।বিয়েতে পণ গ্রহণের রীতি ছিল এবং মৃত্যুর পর স্বামীর পাশে স্ত্রীকে কবর দেওয়া হত । মুসলমান মহিলারা গর্ভে পুত্রসন্তান ধারণের উদ্দেশ্যে হিন্দু নারীর মতই নানা রীতি ও সংস্কার যেমন, মন্ত্রপূত জল ,ঔষধ , কবচ-তাবিচ ইত্যাদি ধারণ করতেন গর্ভাবস্থায় সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণের কুপ্রভাবের কথা স্মরণ করে তারা উপবাস পালন করতেনমধ্যযুগের মুসলমানদের এই সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রসঙ্গ বিচার করে জগদীশ নারায়ণ সরকার মন্তব্য করেন ,-
বাংলায় মুসলমানরা ইসলামের জন্মস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করত । কিন্তু বিজেতাগণ ভিন্ন সংস্কৃতির ধারক বিদেশীদের সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন । সংখ্যার দিক দিয়ে ক্ষুদ্র এই জমির পক্ষে অন্য দেশ থেকে অধিবাসীদের আগমণ সত্ত্বেও অগণিত বৈরী জনসাধারণের মোকাবেলা করা সম্ভব ছিল না । বাস্তবতার আলোকে স্থানীয় বিশ্বাস ও প্রথাকে অক্ষুণ্ন রেখে ধর্মান্তরিত করাই সহজ পন্থা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল । এ ধর্মান্তর গ্রহণ অসম্পূর্ণই থেকে যেতো , কারণ সদ্য ধর্মান্তরিতরা নতুন ধর্মের বৈশিষ্ট্য বা কার্যকারণ সম্বন্ধে অজ্ঞ থাকতো এবং নতুন ধর্মীয় নিয়মকানুনগুলো মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতো না । সদ্য ধর্মান্তরিতরা শুধু নামেই মুসলমান ছিল , বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে , যেখানে বু্দ্ধিজীবিদের প্রভাব ছিল ক্ষীণ । যেখানে তারা তাদের অতীত ঐতিয্য , বিশ্বাস , আচার-আচরণ ও পোশাক-পরিচ্ছদে হিন্দু নিয়ম-কানুনই মেনে চলতো । এদের উপর বিদ্বদজনদের প্রভাব ছিল অতি সামান্য । গ্রামে নিম্নবর্ণের ধর্মান্তরিত হিন্দু কারিগরদের মধ্যে পুরাতন ধর্মবিশ্বাস অক্ষুণ্ন থেকে গিয়েছিল ।
(মুগল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য : জগদীশ নারায়ণ সরকার )
কাজী আবদুল ওদুদ তাঁর শাশ্বত বঙ্গ গ্রন্থে এপ্রসঙ্গে বলেছেন ,- বাংলার কোন কোন সম্ভ্রান্ত মুসলমান দুর্গা-কালী প্রভৃতির পূজা করতেন, একথা সুপ্রসিদ্ধ । এর বড় কারণ বোধহয় এই যে,ওহাবী প্রভাবের পূর্বে মুসলমানদের মানসিক অবস্থা প্রতীক চর্চার একান্ত বিরোধী ছিল না । পীরের কবরে বিশেষ ভক্তি প্রদর্শন , দিন-ক্ষণ পুরোপুরি মেনে চলা ,সমাজে একশ্রেণীর জাতিভেদ স্বীকার করা এসব ব্যাপারে মুসলমানের মনোভাব প্রায় হিন্দুর মতোই ছিল ।
উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ সত্ত্বেও একটা সৌহার্দ্যের সম্পর্ক গড়ে ওঠার দরুণ অনেক বাঙালি মুসলমান কবিরা তখন হিন্দুদের ধর্মীয় বিষয় নিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু করেন প্রাক মুগল যুগে সাবিরিদ খাঁ প্রমুখ কবিরা লৌকিক কাহিনীর ছত্র ছায়ায় লৌকিক দেবদেবীর প্রতি হৃদয়ের শ্রদ্ধাই প্রকাশ করেছেন। সাবিরিদ খাঁ তাঁর বিদ্যাসুন্দর কাব্যের সূচনাতেই দেবী কালিকার বন্দনা গান করে স্বরচিত কয়েকটি সংস্কৃত শ্লোক জুড়ে দিয়েছেন । হিন্দুশাস্ত্র ও পুরাণ সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান ও শ্রদ্ধা এই কাহিনীতে প্রকাশ পেয়েছে । এই সমন্বয়ের ক্ষেত্র গড়ে তোলা ও লালন করার ব্যাপারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন সুফিবাদীরা । মানবীয় রূপকে অধ্যাত্ম প্রেমে উপলব্ধি করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য । ইউসুফ-জুলেখা , বিদ্যাসুন্দর প্রভৃতি চরিত্রকে কবিরা আধ্যাত্মিক রূপক হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন । ক্রমে পীর কাহিনীকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমান সাংস্কৃতিক ঐতিয্যের একটা ভিত্তিও গড়ে উঠে । বলা যায় পীরপূজা হলো বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ । এ প্রসংগে গোলাম মুরশিদ বলেছেন ,-
বাংলার ধর্ম চিরকালই ভক্তিবাদী এবং গুরুমুখী । বাংলাদেশে এই অদ্বৈতবাদী ভক্তিবাদী গুরুমুখী ইসলামই তাই স্ফূর্তি লাভ করেছিল । অদৃশ্য অমূর্ত ঈশ্বরের বদলে দৃশ্যমান পীরই সাধারণ লোকের ভক্তি বেশি আকর্ষণ করেছিলেন । গ্রামবংলার অসংখ্য পীরের মাজার তৈরি হয়েছিলো পীরের প্রতি এই প্রবল ভক্তি থেকে । এসব মাজারে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে পীরপূজা চলেছে , তারও প্রেরণা এই ভক্তিবাদ । ... ইসলাম এবং স্থানীয় ঐতিয্যের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে পীর দেবতায় পরিণত হন এবং দেবতা পরিণত হন পীরে সত্যপীর যেমন ।
সত্যপীর , মাণিকপীর ,কালু খাঁ গাজী , বড় খাঁ গাজী উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই শ্রদ্ধেয় ছিলেনসাধারণ মুসলমানেরা মসজিদে ধর্মীয় প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করার চেয়ে এইসব পীরের মোকামে উপাসনা করাকেই বিশেষ পছন্দ করতেন । আবার হিন্দুদের কাছেও এই মোকামগুলি ছিল আকাঙ্খা ও ইচ্ছাপূরণের প্রার্থনাস্থল । মঙ্গলকাব্য তো বটেই , অন্যান্য ছড়া-পাঁচালি-গান ইত্যাদিতেও দেখা যায় অধিকাংশ হিন্দু কবিরাই তাঁদের রচনায় বাংলার পীর ও তাদের ধর্মীয় আশ্রমের কথা উল্লেখ করে বন্দনা গান করেছেন ,-
উত্তরে বন্দনা গো করলাম কৈলাশ পরবত ।
যেখানে পড়িয়া গো আছে আলির মালামের পায়থর ।।
পশ্চিমে বন্দনা গো করলাম মক্কা এন স্থান ।
উড়দিশে বাজায় সেলাম জমিন মুসলমান ।।
সভা বইর‍্যা বইছ ভাইরে হিন্দু-মুসলমান ।
সভার চরণে আমি জানাইলাম সালাম । ।
আসলামে জমিনে বন্দলাম চান্দে আর সুরুয ।
আলাম কালাম বন্দম কিতাব আর কুরাণ ।।
(মহুয়া পালা)
শাসকবর্গের অত্যাচার এড়াতেও হিন্দুরা অনেকসময় পীর বা গাজীর শরণাপন্ন হয়েছেন । মদনের পালাতে দেখা যায় মেদনমল্ল পরগণার হিন্দু জমিদার মদন রায় বাদশাহী কর সময়মত দিতে না পারায় সুবেদার শায়েস্তা খাঁয়ের রোষ নজরে পড়েন । তখন বড় খাঁ গাজী তাঁকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করলে তিনি বিশেষ জাঁকজমকের সংগে গাজীর পূজার ব্যবস্থা করেন । অপরদিকে মির্জাফরের অসুস্থ অবস্থায় দেবী কিরিটেশ্বরীর চরণামৃত পানের কথা অনেক লোককবি উল্লেখ করেছেন । দরবেশ তাহের মামুদ সরকারের শিষ্য কৃষ্ণহরি তাঁর সত্যপীরের পাঁচালিতে ঈশ্বরের স্বরূপ বর্ণনা করেন এই বলে ,-
এক ব্রহ্ম বিনে আর দুই ব্রহ্ম নাই ।
সকলের কর্তা এক নিরঞ্জন গোঁসাই ।।
ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর যার নাম জপে ।
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড যার এক লোমকূপে ।।
যেই নিরঞ্জনের নাম বিসমিল্লা কয় ।
বিষ্ণু আর বিসমিল্লা কিছু ভিন্ন নয় ।।
নাথসাহিত্যে বিখ্যাত কবি শেখ ফয়জুল্লাও গাজীকে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের অভিন্ন মূর্তি রূপে কল্পনা করেছেন । স্কন্দপুরাণের রেবাখণ্ডেও সত্যপীর সত্যনারায়ণ নামে জায়গা করে নিয়েছেন এবং সেখানে তার পূজাপদ্ধতির কথাও বর্ণিত হয়েছে । ইসলাম ধর্মের নবী সম্বন্ধে এক মুসলমান গ্রামের মোকাদ্দাম একজন ধর্মপ্রচারককে জানিয়েছিলেন যে,নবীজী এক বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আবার যোগীরা এই নবীকে গোরখনাথের শিষ্য বলে মনে করতেন ।
( Cencus Report, 1911 ; Encyclopedia of Islam ,11,491 ; D.C.Sen , Chaitanya & His Age )
পাঁচালিকার আব্দুল গফুর কালুগাজী চম্পাবতীতে পাতালে বলির কণ্যাকে গাজীর জননী বলে উল্লেখ করেছেন ।কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ তাঁর মনসামঙ্গল কাব্যে মনসার কোপ থেকে বাসর গৃহে লক্ষীন্দরকে বাঁচাতে শৈব চাঁদ সদাগরকে দিয়ে অন্যান্য রক্ষাকবচের সঙ্গে কোরাণও পাঠিয়েছিলেন । একই ঈশ্বরকে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে প্রত্যক্ষ্ করা কিংবা -
হিন্দুর দেবতা হইল মুসলমানের পীর ।
দুই কুলে লয়ে সেবা হইল জাহির ।।
এই সমন্বয় ও সম্প্রীতিই মধ্যযুগের মূল প্রাণের সুর,-
হেঁদু আর মুসলমান একই পিণ্ডের দড়ি ।
কেহ বলে আল্লাহ আর কেহ বলে হরি ।।
বিছমিল্লা আর ছিরিবিষ্টু একই কায়ান ।
দো যাঁকে করি দিয়ে পরভু রাম রহিম ।।
(মলুয়া পালা)
নাথধর্মতত্ত্ব আশ্রয়ে যে সাহিত্যধারা মধ্যযুগে গড়ে ওঠে তার মধ্যে গুরু ও মুর্শিদ বাদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় এধারার অন্যতম কবি শেখ ফয়জুল্লা তাঁর গোরক্ষবিজয় গ্রন্থের সূচনায় ঈশ্বরের বন্দনাগান করে বলেন,-
প্রথমে প্রণাম করি প্রভু করতার ।
নিয়মে সৃজিলা প্রভু সকল সংসার ।।
স্বর্গ মর্ত পাতাল সৃজিলা ত্রিভুবন ।
নানারূপে কেলি করে না জাএ লক্ষণ ।।
তবে প্রণমিয়া তান নিজ অবতার ।
নিজ অংশে করিলেক হইতে প্রচার ।।
শুকুর মাহমুদের গুপিচন্দ্রের সন্ন্যাস কাব্যের বন্দনায়ও একই সুর শোনা যায়,-
প্রথমে বন্দিব আমি নাম নিরঞ্জন ।
যাহাতে হইল ভাই যোগের সৃজন ।।
তবে বন্দিব সিদ্ধা হাড়িফা জলন্ধর ।
যোগ মধ্যে বন্দ সিদ্ধা গোর্খ হরিহর ।।
কানেফা বন্দিব আর বানিজে ভাদাই ।
মছলন্দি সিদ্ধা বন্দ নামেতে মিন্যাই ।।
এখানে মীননাথ হয়ে উঠলেন মছলন্দি পীর । আর ফয়জুল্লা মীননাথের কণ্ঠে অকুণ্ঠ চিত্তে উচ্চারণ করেন ,-
মোর গুরু মহাদেব জগত ঈশ্বর ।
গঙ্গা গৌরী দুই নারী থাকে নিরন্তর ।।
যার দুই নারী তার সাক্ষাতে দিগম্বর ।
হেনরূপে করে গুরু কেলি নিরন্তর ।
তান আছে গৃহবাস আহ্মি কোন হই ।
ভবে মোর একগতি শুন আমি কই ।।
রামায়ণ কাহিনীর জনপ্রিয়তা মুসলমান সমাজে যে কতখানি প্রবল ছিল , রাজসভার পৃষ্টপোশকতার বাইরে অসংখ্য কবির রচনায় তার প্রমাণ রয়েছে । সাদেক আলীর রামচন্দ্রের বনবাস এর এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন । মুহম্মদ খান হিন্দু ধর্মতত্ত্ব নিয়ে রূপকাশ্রয়ে রচনা করেন সত্য কলি বিবাদ সম্বাদকাব্যমধ্যে কলিযুগের লক্ষণ বর্ননা করতে গিয়ে মুহাম্মদ তাঁর চারপাশের বাস্তব জগতের চালচিত্রকেই তুলে ধরেছেন ,-
বৃদ্ধ হৈব নির্লজ্জ বালকে না মানিবে ।
গুরুজন বলি কেহ মান্য না করিবে ।।
সাধু সব কপটে হরিব পর বিত্তি ।
ধনদান না করিব না অর্জিত কীর্ত্তি ।।- ইত্যাদি
অনেক মুসলমান কবি হিন্দু কর্মফলবাদকেও স্বীকার করেছেন।যেমন মর্দনের নছিরনামা য় আছে ,-
দেখ দেখ জার জেই আছে কর্মভোগ ।
সেই মতে কর্মফলে ভুঞ্জে দুঃখ সুখ ।।
হিন্দু যোগতন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে সৃষ্টিরহস্য , শূন্যরহস্য ও শূক্ররহস্য প্রভৃতি বিষয়েও বিভিন্ন মুসলমান কবিরা তাঁদের কাব্য রচনা করেছেন । তালিবনামা গ্রন্থে শেখচান্দ বলেন ।-
এ সব রঙ্গের জন্ম ছেহা জন্ম হোতে ।
ভাঙ্গিয়া সকল রঙ্গ মিশিব ছেহাতে ।।
আদ্যেত আছিল প্রভু শূন্যের শরীর ।
ছেয়া রঙ্গে নিজ অঙ্গে হইলেন্ত স্থির ।।
সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কবিরা বলেছেন মহম্মদ , নিরঞ্জন আর ব্রহ্মা সকলেরই সৃষ্টি এক উৎস থেকে । ঘর্মসিক্ত নূরের বাম কণ্ঠ থেকে এক বিন্দু ঘাম ঝড়ে পড়ল , আর সেই ঘাম থেকে ,-ব্রহ্মা পয়দা তখন হৈল । ত্রিবেণীর ঘাটে নিত্য স্নান মহাপূণ্যপ্রদ । আব , আতস , বাত প্রভৃতি উপাদান সমূহ এবং ইড়া-পিঙ্গলা প্রভৃতি থাকা সত্ত্বেও প্রাণ দেহ ছেড়ে চলে যায় । কবিদের বিশ্বাস, সাধনার ফলে সিদ্ধিলাভ করতে না পারলে মৃত্যুকে এড়ানো যাবে না । মুসলমান কবিদের এই ধারণার পেছনে হিন্দু মতবাদের পাশাপাশি সুফিতত্ত্ব ও মরমিয়াবাদের প্রভাবটিও প্রবল ছিল । পণ্ডিতদের অনুমান এই যে পারস্যের সুফীধর্মের যোগপদ্ধতি বাংলাদেশে এসে কামরূপের তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ ভোজবর্মণ রচিত সংস্কৃত যোগশাস্ত্রের গ্রন্থ অমৃতকুম্ভ দ্বারা প্রভাবান্বিত কুলকুন্ডলিনি শক্তিকে এই সুফীরা লতিফা এবং ষড়দল পদ্মকে বড়লতিফা বলে উল্লেখ করেছেন । সাধনতত্ত্বের বর্ণনায়ও হিন্দু যোগতাত্ত্বিকদের পদানুসরণ করেছেন ,-
ধ্বনি মূলে ব্রহ্ম নাম বায়ুর সঙ্গতি।
সেই নাম পবনে চলএ প্রতিনিতি ।।
সেই ধ্বনি পরমহংস কহে সিদ্ধাগণ ।
হংসনাম তেজেত নির্মল তন মন ।।
* * *
পূরক রেচক সঙ্গে হৃদের কম্পনে ।।
পূরক রেচক সঙ্গে রাখি মহাহংস ।
এক যোগে সাধনে সে শরীর নহে ধ্বংস ।।
এই জ্ঞানমার্গীয় মরমিয়া সুফিবাদ আর চৈতন্যোত্তর সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্মই পরবর্তী সময়ে বাউল ধর্মের সুত্রপাত ঘটিয়েছিল।বৈষ্ণব সহজিয়াদের মত বাউলেরাও তাঁদের ধর্মপ্রবর্তক হিসেবে নিত্যানন্দ পুত্র বীরভদ্রের নাম উল্লেখ করে থাকেন । বীরভদ্রের শিক্ষামূলক কড়চা নামে একটি গ্রন্থে বৈষ্ণব ও ইসলাম ধর্মের সমন্বয় সূত্রও নির্দেশ করা হয়েছে । এই গ্রন্থে মহাপ্রভু নিত্যানন্দ তাঁর পুত্রকে মদিনা গিয়ে হজরতের গৃহে মাধববিবির কাছে দীক্ষা গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন এই বলে ,-
শীঘ্র করে যাহ তুমি মদিনা শহরে ।
যথায় আছেন বিবি হজরতের ঘরে ।।
তথায় যাই শিক্ষা লহ মাধববিবির সনে ।
তাহার শরীরে প্রভু আছেন বর্তমানে ।।
মাধব বিবি বিনে তোর শিক্ষা দিতে নাই ।
তাঁহার শরীরে আছেন চৈতন্য গোঁসাই ।।
হিন্দু ও মুসলমান এই উভয় সম্প্রদায়ের মিলিত সাংস্কৃতিক ঐতিয্যের পরিচয়বাহী অন্যতম সাধনা হল দরবেশ-পীর সাধনা । দরবেশ শাখাভূক্ত তাত্ত্বিক মাধক আলীরাজা হিন্দু তন্ত্র ও যোগশাস্ত্রে অভিজ্ঞতার দরুণ মুসলমানের সংগে সংগে অনেক হিন্দুকেও আকৃষ্ট করেছিলেন । তিনি হিন্দু গুরুবাদের একনিষ্ট ভক্ত ছিলেন । কবি সৈয়দ সুলতানও গুরুর চরণ স্মরণ করে দেহবাদী সাধনায় আত্মমগ্ন হয়ে নানাবিধ পদ রচনা করেছেন । আলীরাজাও একইভাবে গুরুর আরাধনা করেছেন ,-
গুরুর চরণ মূলে থাকি আলীরাজা বলে
রাধা হোন্তে নহে কানু দূরে ।
সৈয়দ সুলতান আক্ষেপ করেন ,-
নামে নহি ব্রাহ্মণ জ্ঞানে নহি পণ্ডিত
ধ্যানে নহি পরম যোগী ।
শুনিয়া গুরুর বানী স্থির নহে মোর প্রাণী
মনে লয় হৈই যাম বৈরাগী ।।
সাধন পথ দ্রষ্টা এই গুরুই যে ইসলামের মুর্শিদ তারই প্রমাণ পাওয়া যায় সেরাজের একটি পদে ,-
কায়াসুদ্ধ্ব হয় জান মুর্সিদ ভজিলে ।
লাঠি লৈক্ষে চলে যেন আন্দিয়াল সকলে ।।
মুর্সিদ প্রসাদে হয় আখিঁর প্রকাশ ।
মিহির কিরণে যেন উজ্জ্বল আকাশ ।।
মুসলমান লোককবিরা যে শুধুমাত্র হিন্দু ও ইসলাম এই উভয় ধর্মের সাম্য সন্ধানেই রত ছিলেন তা নয়, বরং ধর্মত্যাগী হওয়া সত্ত্বেও অনেকক্ষেত্রে ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে আদর্শ বৈষ্ণবোচিত গুণাবলী নিয়ে পদসাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন । অমিয় নিমাইর প্রেম ফল্গুধারা তাঁদের চেতনাকে উজ্জীবিত করেছিল । এই বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মুসলমান কবিরা বৈষ্ণব ভক্তিবাদ ও মরমিয়া সুফিবাদকে এক করে ফেলেছিলেন । ইসলাম ধর্মে আল্লাহ যেখানে প্রভু, মানুষ সেখানে বান্দা বা দাস । কিন্তু সুফীদের কাছে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক প্রেমের , প্রভু-ভৃত্যের নয় । তাই মুসলমান কবিরা সহজেই রাধাকৃষ্ণের জীবাত্মা-পরমাত্মা ভাব স্বরূপকে আশেক-মাশুকের সঙ্গে একাকার করে নিয়েছিলেন । অনেকসময় তাঁরা তাঁদের ধর্মীয় প্রবক্তাদেরও শ্রী কৃষ্ণের মধ্যে উপলব্ধি করেছিলেন । বদিউজ্জামাল তাই অকপটে বলেন ,-
সবে বলে কালারে কালা আমি বলি শ্যাম ।
কালার ভিতরে লুকাই রে রইছে মওলার নিজ নাম ।
আসমান কালা জমিন রে কালা কালা পবন পানি ।
চাঁদ কালা সূর্যরে কালা , কালা মাওলাজি রব্বানি ।।
সুফীপ্রভাবে মুসলমান কবিরা ঈশ্বরকে রাধা বলে সম্বোধন করতে চাইলেও অনেকসময় মৌলবীদের চোখরাঙানো এতে বাধা হয়ে দাঁড়াত , সেই বাস্তব ছবিটি ধরা পড়েছে বামন উদাসের পদে ,-
হিন্দুরা বলে তোমায় রাধা , আমি বলি খোদা রাধা বলিয়া ডাকিলে মুল্লামুন্সিতে দেয় বাধা ।।
বৈষ্ণবীয় স্বকীয়া-পরকীয়া তত্ত্বও তাদের অগোচর ছিলনা ,-
স্বকীয়ার সঙ্গে নহে অতি প্রেমরস ।
পরকীয়া সঙ্গে যোগ্য প্রেমের মানস ।।
এই কবিরা রাধাকৃষ্ণের অনুরাগ এবং বিশ্বের স্বরূপ বর্ণনার মাধ্যমে একেশ্বরবাদেরও প্রচার করেছেন,- এক কায়া এক ছায়া নাহিক দোসর ।
এক তন এক মন আছে একেশ্বর ।।
ত্রিজগত এক কায়া এক করতার
এক প্রিভু সেবে জপে সব জীবধর ।।
বৈষ্ণব সহজিয়ারা যাকে পরমপুরষ বলেছেন , বাউলদের কাছে তিনিই হলেন সাঁই , আর মুসলমান বাউলদের কাছে তিনিই হলেন আলেখ নূরফকির সাধক সৈয়দ মর্তুজা মুসলমান বাউল হয়েও হিন্দুরই মতো পরমপুরুষকে সাঁই বলে সম্বোধন করে তাঁর সংগে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের অভিন্নতার কথা উল্লেখ করেছেন ,- সাঁই একবিনে মাওলা একবিনে আর নাহি কোই।
আরেক সমন্বয়বাদী কবি মহম্মদও বৈষ্ণব ধর্মের হ্লাদিনী শক্তির স্বরূপ অনায়াসে ব্যক্ত করেন,-
আল্লা মহম্মদ রাধাকৃষ্ণ একাঙ্গ একাত্মা যার।
এক হাতে বাজে না তালি এক সুরের কথা বলি
নীরে ক্ষীরে চলাচলি বীজের এই বিচার ।
পিতা আল্লা মাতা আহ্লাদিনী মর্ম বোঝা হল ভার ।।
মুসলমান কবিদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় সম্প্রীতি গড়ে তোলার যে প্রয়াস দেখা যায় তা সেকালে হিন্দু কবিদেরও ইসলাম বিষয়ক কাব্য , কবিতা ও সঙ্গীত রচনায় উৎসাহিত করেছিল । যদিও এই প্রয়াসের চেষ্টা সীমিতই ছিল । প্রথাগত সাহিত্যচর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে দেরী হলেও কিছু হিন্দু কবি-সাহিত্যিক নতুন যাত্রাপথের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় রাধাচরণ , মানিকদাস প্রমুখ কবিদের আবির্ভাব ঘটে । ধর্মীয় সংকীর্ণতার বন্ধন ছিন্ন করে মাণিকদাস আল্লার কাছে করুণা ভিক্ষা করে বলেন ,- আল্লা অন্তকালে কি বোল বুলিম নিজ ঘরে গিয়া কি হৈল কি হৈল মোরে দিয়া ।।
জেতের ফাতা বিকিয়েছে সাত বাজারে লালনের এই গানেও জাতিবর্ণভেদের উর্ধ্বে উদার মানবিকতা বোধের যে পরিচয় আমরা পাই সেই মানবধর্ম প্রচারই ছিল সেযুগের কাব্যসাহিত্য সাধনার এক বিশেষ আন্তরধর্ম । এই ধারাকেই আজও লালন করে চলেছে সাধারণ গ্রামীণ মানুষ তাদের হৃদয়ে ও ভাবপ্রকাশে । বিপন্ন সময় আর প্রতিকূল সংকটের মধ্যে এই পথই হল মুক্তির পথ । মধ্যযুগের কবিরা দ্বন্দ্ব-সংকটের মধ্যেও এই মানব প্রীতি ও ঐক্যবোধের সাধনার ধারাটিকেই প্রশস্ত করে তুলেছিলেন
·

ছিন্নমূল ও উত্তরাধিকার



ছেলেবেলায় বাবা গল্প বলতেন । পূজোর ছুটিতে করিমগঞ্জ থেকে নৌকো করে বাংলাদেশের সেই কোন পঞ্চখন্ডের খসি গ্রামে যাবার গল্প । তখনও ভারত ভাগ হয়নি । দাদু চাকরী করতেন করিমগঞ্জের মুন্সেফ কোর্টে । আর বাবারা ক'ভাই পড়াশোনার জন্য থাকতেন তাঁর সঙ্গে । স্কুল ছুটি হলেই সবাই মিলে বাড়ির উদ্দেশ্যে নৌকোযাত্রা । নদীপথে দুরাত্তিরের যাত্রা । মাঝপথে নদীতীরে মাঝিদের রান্নার গল্প বলতে বলতে বাবার চোখ চিক চিক করে উঠত । বাড়ির ঘাটে পৌঁছে ফলবাগান আর চানের পুকুর , খাবার জলের পুকুর , ' রাইয়ত ' -দের আলাদা খাবার জলের পুকুর পেরিয়ে তবে না বিশাল ঠাকুরদালানে পৌঁছোনো -- ঘরে ফেরা । আমার কাছে তখন বাবার সেই বাড়ি মানেই চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পুকুরের মাঝখানে এক বিশাল বাড়ি । বাবা আজীবন তাঁর সেই বাড়ির গল্প করে গেছেন । ফলবাগানের কথা , মাছ ধরা , রকমারি খেলাধূলা , দূর্গাপূজার আনন্দ উৎসব , ' রাইয়ত '- দের গল্প -- এগুলো ছিল তাঁর প্রিয় বিষয় । আর একটা গল্প বাবা খুব বলতেন । ভারতবর্ষ স্বাধীন হবার দিনের গল্প । কিছুদিন থেকেই কানাকানি শোনা যাচ্ছিল করিমগঞ্জ নাকি জুড়ছে পূর্ব পাকিস্থানের সঙ্গে । যথারীতি ভারত স্বাধীন হবার একদিন আগেই করিমগঞ্জে স্বাধীনতা এলো । দেশটা হয়ে গেল পাকিস্থান । বাবারা আগেই বাড়ির মহিলাদের শিলচরে জ্যেঠুর কাছে পাঠিয়ে নিজেরা ক'ভাই থেকে গিয়েছিলেন করিমগঞ্জে । স্বাধীনতা উৎসবের অঙ্গ হিসেবে সেদিন জকিগঞ্জে এক বিশাল ফুটবল ম্যাচ আয়োজিত হয়েছিল । বাবারা কয়েকজন আমন্ত্রিত হয়ে সেই ম্যাচ খেলতে গেলেন । অবশ্য পরে করিমগঞ্জ আবার ভারতের সঙ্গে জুড়ে গেলো । সে এক অন্য গল্প । যা বলছিলাম , এই গল্পগুলি বলতে বলতে বাবার চেহারাটা পাল্টে যেতে দেখেছি । গল্প বলার আনন্দের মাধ্যমে বাবা যেন ফিরে যেতেন তাঁর সেই স্মৃতির পুরোনো গ্রামে । ছেলেবেলায় এই গল্পগুলি ছিল আমার কাছে রূপকথার মত । অনেকবার শুনে শুনে গ্রামটির একটা ছবি মনের কোনে আঁকা ছিল । এখনও চোখ বুজে সেই ছবি স্পষ্ট দেখতে পাই । কিন্তু একই গল্পের পুনরাবৃত্তিতে বড় হয়ে মুগ্ধতা হারিয়ে গেলো । তখন বিরক্ত হতাম । কিন্তু এই প্রসঙ্গে বাবার উৎসাহে কোনোদিন ঘাটতি চোখে পড়েনি ।যতবার এই এক গল্প বলতে শুরু করেছেন , ঠিক প্রথমবারের উৎসাহ নিয়েই শুরু করেছেন ।

আজ বাবা নেই । আমরা এখন বড় হয়ে গেছি । তখন বুঝতে পারিনি , আজ বাবার ছিন্নমূল আত্মার মানসিক কষ্টকে উপলব্ধি করি। তবুতো বাবাকে উদ্বাস্তু হতে হয়নি , কিন্তু শেকড়টা উপড়ে ফেলতে হয়েছিল বৈকি । আজ যখন নিজের শেকড়টা উপড়ে ফেলে চলে আসতে হয়েছে অন্য এক নতুন পরিবেশে , তখন কোথায় যেন বাবার কষ্টের সঙ্গে নিজের কষ্টটা একাত্ম হয়ে যায় । বাবার মতো আমার দেশটা পালটে যায়নি ঠিকই , এমনকি আছি একই রাজ্যে -- তবু কেনো সইতে হয় এই শেকড় উপড়ানোর যন্ত্রনা !!! নতুন করে শেকড় চাড়িয়ে দিতে পারিনি বলে ? এ কোন উত্তরাধিকার ! কালপ্রবাহে এখন আমি বাবার ভূমিকায় । আমার ছোট ছেলে যথেষ্টই ছোটো । বড় ছেলেকে গল্প শোনাই আমার সেই মাতৃশহরের । সে এখন মুগ্ধ হয়ে শোনে । অভিজ্ঞতা থেকে জানি ওর সেই মুগ্ধতা বেশীদিন নয় । কিছুদিন পরে বিরক্ত হবে । তাতে আমার উৎসাহ কমবে কী ? এবং স্মৃতি । এখন পুরাতন এবং প্রচলিত সেই সত্যিকে অবলম্বন করার সময় হয়েছে -- নতুনকে আঁকড়ে ধরাই জীবনশিল্প । মন ঘোরাতে নতুন পরিবেশের ভালো সবকিছুর কথা ভাবি । আরো অনেকগুলো বছর এখানে থাকতে হবে যে ! মন ভালো রাখার এ এক উপায় । কিন্তু ' মন কি অত সহজ ব্যাপার ' !!!!!!!


( বাবার ভীষণ ইচ্ছে ছিল তাঁর সেই পুরোনো গ্রামকে ফিরে দেখার । কিন্তু ভৌগলিক বাঁধা তাঁর এই ইচ্ছেপূরণের অন্তরায় ছিল । অল্প আয়াসে হয়ত সেই অন্তরায় কাটিয়ে উঠা সম্ভব হত । কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি । আজ বাবার সেই একান্ত ইচ্ছে গোপনে নিজের মনে বহন করে চলি -- যদি একবার অন্তত সেই ' পুকুর ঘেরা গ্রামটিকে ' দেখে আসা যায় !!! )

শিল্প ভাবনা





" শিল্পশাস্ত্র সমূহের দ্বারায় যজমান নিজের আত্মাকে ছন্দোময় করিয়া যথার্থ যে সংস্কৃতি তাই লাভ করেন এবং প্রাণের সহিত বাক্যকে , চক্ষুর সহিত মনকে , শ্রোত্রের সহিত আত্মাকে মিলিত করেন । " -- ।। বেদ ।।

কস্মিনকালেও শিল্পশাস্ত্রে আমার কোনো দক্ষতা ছিল না , শিল্পবুদ্ধি তো দূরস্থান । তা সত্ত্বেও দুঃসাহসী হতে সাধ যায় । প্রবৃত্তিজাত মন অসাবধানে পা ফেলে শিল্পের জগতে -- শিল্পভাবনায় । হঠাৎ হঠাৎ কোনো ছবি ভীষণ ভালো লেগে যায় , আবেগে মূর্চ্ছিত হয় হৃদয় । বিস্মিত মনের অপার আনন্দ রসের আস্বাদন লাভ করে । শিল্পতত্ত্বের ঊর্ধ্বে উঠে তখন মানব প্রবৃত্তিকে কুর্ণিশ জানাতে বড় ইচ্ছে যায় । এই প্রবৃত্তিই তো আদিম চিত্রকরের চিত্তবৃত্তিকে প্রথম চিত্রকর্মের দিকে আকর্ষণ করেছিল । সৃষ্টি হয়েছিল গুহাচিত্র ,শিলাপট , এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্রেও লেগেছিল শিল্পের ছোঁয়া । এ যেন অকিঞ্চিতের মধ্যে সুন্দরের প্রাণপ্রতিষ্টার সাধনা -- অরূপকে রূপে ধরার প্রয়াস , আবার রূপকে রূপান্তরিত করার চেষ্টাও । শিল্পসাধনাই তো শিল্পীকে প্রতিস্থাপন করে সৃষ্টির গভীরে , শিল্পী উপলব্ধি করতে পারেন বিধাতার সৃষ্টির স্বরূপ ।

" পৃথক পৃথক ক্রিয়াভির্হি কলাভেদস্তু জায়তে । " ।। শুক্রনীতিসার ।।
পৃথক পৃথক ক্রিয়াকে অবলম্বন করেই বিভিন্ন কলার প্রকাশ ঘটে । কেউ নিরেট পাথরকে প্রাণদান করছে তো কেউ মাটি নিয়ে খেলছে সৃষ্টির খেলা । কাগজ-রং-তুলি তো আছেই । শিল্পের এই বিভিন্ন ধারা প্রতিনিয়ত আমাদের জীবনকেও করে তোলে শিল্পিত । সৃষ্টির সেই কোন আদিম লগ্নে মানুষ নিজের প্রয়োজনে তৈরি করেছিল মাটির হাঁড়িকুড়ি । কিন্তু মানুষ শুধু প্রয়োজন নিয়ে বাঁচেনা , তাঁর জীবনে চাই সুন্দরের ছোঁয়া । তাই খাবার তৈজসপত্রেও উঠে আসে কারুকার্য -- নকশা । ক্ষুধার নিবৃত্তি হয় -- সেইসঙ্গে তৃপ্ত হয় রূপদৃষ্টি , মনন ও সৌন্দর্যভাবনা । ব্যবহারিক জীবনের প্রতিটি বস্তুতে এভাবে ধীরে ধীরে শিল্পের ছোঁয়া লাগে , আরো পারিপাট্যে পূর্ণ হয় তার প্রেরণা ও কৌশল ।

ভাষায় আবেগ প্রকাশের অনেক আগেই আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম চিত্রভাষার । গুহাচিত্র এর প্রমাণ । না বলা কথা চিন্তা ও ভাবনাকে মানুষ সবসময়ই মুক্তি দিয়েছে তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে । সুর কবিতা ছবি গান এর এক একটা মাধ্যম মাত্র । স্রষ্টার সৃষ্টির আনন্দ স্বরূপকে মানুষ এভাবেই আত্মস্থ করতে চেয়েছে । শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যম বাস্তব জীবনকে অবলম্বন করে সৃষ্টি করে এক বস্তুনিরপেক্ষ মায়ার জগৎ -- যা আমাদের নিয়ে যায় এক ' ঘন-আনন্দ-স্বরূপ ' চেতনায় , উপনিষদের আদর্শে এই চেতনাকে ব্রহ্ম আস্বাদের সহোদর বলে উল্লেখ করা হয়েছে । এর চর্চা আমাদের দিব্য দৃষ্টি উন্মুক্ত করে , চোখের সামনে খুলে দেয় অলৌকিক দ্বার । সৌন্দর্যের নিবিড়তর পাঠে হৃদয় পরিশীলিত হয় । মানুষ সাধনার দ্বারা উপলব্ধি করে শিল্পের রস ।

চিত্রভাষা সবার সঙ্গে কথা বলেনা । ওই যে বললাম , সৃষ্টির যে কোনো ধারাকে হৃদয়ঙ্গম করতে হলে চাই সাধনা -- চর্চা । কাব্যচর্চায় একটা কথা আছে যে রস হচ্ছে ' সহৃদয়হৃদয়সংবাদী ' । অর্থাৎ , কাব্যচর্চার মূল লক্ষ্য যে রস তা কিন্তু সবার কাছে সহজে ধরা দেয় না । একমাত্র কাব্যচর্চা এবং অনুশীলনের মাধ্যমে যাদের মন রসাস্বাদ গ্রহণের উপযুক্ত অর্থাৎ সহৃদয় হয়ে উঠে তেমন লোকই এর আস্বাদ লাভ করতে পারে । সহৃদয় লোকের হৃদয়ের বাইরে রসের আর কোনো স্বতন্ত্র আত্মা বা অস্তিত্ত্ব নেই । তেমনি শিল্প ভাষাও বিনা সাধনায় আমাদের সঙ্গে কথা বলে না । সব ভাষারই নিজস্ব ব্যাকরণ অলঙ্কার থাকে । সেই তত্ত্বের চর্চায় না গিয়েও যদি শুধুমাত্র সহৃদয়হৃদয়সংবাদী অলৌকিক মনন দ্বারা আমরা চিত্রভাষার আত্মার স্বরূপকে অনুধাবন করার চেষ্টা করি , তাহলে হয়ত আমাদের মতো সাধারণ শিল্পরসিকদের কাছে চিত্রভাষার আনন্দময় রূপ হৃদয়- ভাবনায় সহজেই ধরা দেবে ।

বর্ষামঙ্গল




... বাঁধন-হারা বৃষ্টি ধারা ঝরছে রয়ে রয়ে

অবশেষে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে সত্যিই বর্ষা নামল । আমাদের এই ছোট্ট শহরে এ এক বিশাল পাওনা । বিধাতার অভিশাপে মেঘেদের এখানে বিশ্রাম নেওয়াও বারণ । অতি কৌতুহলী উচ্ছ্বল দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি ইতি-উতি উঁকি দিলেও হাওয়ার কড়া পাহারা মুহূর্তে তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যায় । পাশের গ্রাম থেকে আসা সহকর্মী নিদাঘ-তপ্ত দুপুরে যখন বৃষ্টি ভেজা রাস্তার দুরবস্থার কথা শোনান অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস পড়ে । ঝড়ের দিনে আম কুড়ানো , কোঁচড় ভর্তি করে শিল তোলা , এমনকি মেঘ গর্জনে ভীত-ত্রস্ত ( কে জানে হয়তো বা আহ্লাদিত ) কই মাছেরা ডাঙায় উঠে এলে অতি উৎসাহীদের মাছ ধরার ভীড় ( দুঃসাহসী এই কাজে নিজে কখনো যোগদান করার সাহস পাইনি ) -- সেইসব পুরোনো স্মৃতির ঝিলিক মনকে আচ্ছন্ন করে । সেই স্মৃতির শহর অবশ্যই অন্য এক ঠাঁই -- যার থেকে দূরে কর্মসূত্রে আপাতত অন্যত্র অবস্থান করতে হচ্ছে । সেই মাতৃশহর ঘিরে আছে খুব সুন্দর এক নদী -- কুশিয়ারা । ওপারে বাংলাদেশ । ছেলেবেলায় আমার কাছে নদীর ওপার মাত্রই বাংলাদেশ -- সে বরাকই হোক , কিংবা ব্রহ্মপুত্র । দেশের সীমা বোঝার বয়স না হওয়া অব্দি নদীতে নৌকো চড়তে পারতাম না বলে মনে একটা দুঃখ ছিল । আশ-পাশের আর দশটা গ্রাম-শহরেও একটা করে নদী । গাড়ীতে কোথাও ঘুরতে যাই তো পাশেপাশে পথ দেখিয়ে নদীও চলে । নদী এবং জনপদের এই পাশাপাশি অবস্থান শুধু স্বাভাবিক নয় , সত্য বলেই জানতাম । আর একটা মজার (অনেকের কাছেই দুঃখের ) ব্যাপার হলো আমাদের ওই অঞ্চলে গ্রীষ্ম বলে কোনো ঋতু ছিল না , এখনো নেই । এই ঋতুর পুরোটাই গ্রাস করেছে বর্ষা ।

এখানে আবার উল্টো । গ্রীষ্মদেবতার দেবোত্তর সম্পত্তিতে বর্ষার প্রবেশ নিষেধ । নদীও বুঝি ভয়ে এই পথ মাড়াতে ভুলে গেছে । স্বাভাবিক ভাবেই পয়লা আষাঢ়ে বর্ষার এই মঙ্গলধ্বনি হৃদয়ে পুলক জাগায় । বৃষ্টির ধূপ-গন্ধে সিক্ত হয় মন । নববর্ষার ধারাজলে মাটির গভীরে নামে শিকড় । রূপকথার আমেজে ভাসে মায়াবী শরীর । ফ্যাকাশে জীবনযাত্রা খুঁজে পায় অন্যতর জীবনের স্বাদ । ঘরে-ঘরে খিচুড়ির গন্ধ ছড়ায় । নর-নারী পরস্পরের মুখোমুখি বসে । নিভৃত জীবন জুড়ে জেগে থাকে বর্ষার গান -- বর্ষামঙ্গল ।

ঘুমভাঙা ভোর


অনেকদিন ধরে কিছু লিখি না । কখনও মনে হয় ফুরিয়ে গেছি । আবার না লেখার পেছনে যুক্তিও তো ঢের । সাজানো সেই যুক্তির জোর মনকে বেশ তৃপ্ত করে । তবুও শান্তি কই !! সেলাই করি । ঘর সাজাই । নতুন উদ্যমে কিছু করার কথা ভাবি । ছেলেদের দস্যিপনায় উত্তেজিত হই । আয়েস করে ঘন্টার পর ঘন্টা ঘুমাই । মাঝে-মাঝে বিষন্ন নির্জনে গাধার পিঠের বোঝার কথা মনে হয় । ছেলেদের আহ্লাদেপনায় নিজের ছেলেবেলা আরোও নিবিড় করে আঁকড়ে ধরে । আশৈশবের অভ্যেসগুলো গাঢ় মমতায় চর্চা করি । আবার ভাবি -- ধ্যাত্ , সবই তো ফাঁকি । এই ফাঁকটাকে পূর্ন করতে মনের ভেতর অনেক না বলা কথার ফেনাপুঞ্জ উথলে উঠে । এ বড় সহজ কষ্ট নয় । স্বপ্ন দেখি । বুকের গভীরে এর রেশ কিছুদিন বন্দী হয়ে থাকে । স্বপ্নরীতি পুরোনো হলে কল্পনায় আবাস গড়ি । যাত্রা চলতেই থাকে ।

এই যাত্রার গোলোক পথেই আবারও ফিরে আসি ' লেখা-না-লেখার ' জগতে । না বলা কথার উচ্ছল ধারাজলে তৈরি হয় শব্দের বেড়াজাল -- কবিতা । ভালোবাসা-ভালোলাগা তখন মিলেমিশে একাকার । খোলা জানালায় হাত বাড়ালেই মুঠোয় সমস্ত পৃথিবী । বুকের ভেতর গড়ায় আনন্দের দানা । সত্তার আনন্দই তো শেষ কথা -- তাই না ? আর কী চাই !!!!!!!

কবিতার জন্ম : কবির জন্মান্তর



"যখন বিষন্ন তাপে প্রধূম গোধূলি তার করুণাবসন ফেলে সূর্যমুখী পৃথিবীকে ঢাকে
কঠিন বিলাপে কাঁপে উপশিরা-শিরা , জ্যোতিষ্কলোকের রূপসীরা একে একে
ছিন্ন করে দয়িত-আকাশ , যখন প্রেমের সত্য ভুবনে ভুবনে ফেরে করুণ লেখায় ,
তুমিও আসন্ন চন্দ্রে মেলে দাও হৃদয় তোমার , আমি থরোথরো শীতে যন্ত্রনার
শিখা মেলি আতপ-তির্যক , যখন পৃথিবী কাঁপে মৃততেজা মুঠোতে আমার --

তখন কবিতা মিতা , প্রিয় থেকে প্রিয় সখী , সুহৃদ , সুন্দর ।"

-- ১১ জানুয়ারি । দুপুর : শঙ্খ ঘোষ ।



প্যারিসের এক হোটেল । পিকাসো দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে । দাড়ি কামাচ্ছিলেন । আপোলিনেয়ারের মৃত্যুসংবাদ তখনই কানে এল । এক-দিগন্ত যন্ত্রনায় ভেঙ্গে গেল হৃদয় । সেইসঙ্গে মুখটাও । শূন্য দৃষ্টি আয়নায় পড়তেই চমকে উঠলেন শিল্পী । এ কার মুখ ? রেজার রেখে হাতে তুলে নিলেন কাগজ-পেনসিল । ব্যথিত হৃদয়-আর্তি আয়নায় প্রতিফলিত সেই দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া মুখচ্ছবিকে ক্যানভাসে রূপ দিতে লাগল । আত্মার আলোড়িত আবেগ জন্ম দিল এক যুগান্তকারী অমর সৃষ্টির । আত্মিক যন্ত্রনার এই শিল্পিত উত্তরণ শিল্পীকে দিল আবেগিক মুক্তি । কিউবিক রীতির এই আত্মপ্রতিকৃতি দ্বারা পিকাসো বন্ধুর মৃত্যুকে জানালেন বিনম্র শ্রদ্ধা । আর এই সৃষ্টির সূত্র ধরেই শিল্পীজীবনেও ঘটল জন্মান্তর -- 'এ ফেয়ারওয়েল টু ইয়ুথ ' । যৌবনের কল্পলোককে বিদায় জানিয়ে শিল্পী পা দিলেন প্রৌঢ়ত্বের শক্ত মাটিতে ।

জীবনে যা সত্য , শিল্প সেই সত্যেরই সংহত ও সুন্দর প্রতিভাস । কবিতাও এই সত্যের সারবস্তুকে গ্রহণ করে শোভন হয়ে উঠে এবং শিল্পিত উৎকর্ষতা লাভ করে । আত্মসত্তার সুখ-আহ্লাদ ,হর্ষ-পুলক , দুঃখ-যন্ত্রনা , আবেগ-দরদ , ব্যাথা-মনস্তাপ অনুভূতিশীল কবিকে সৃষ্টির এক প্রদীপ্ত উৎসের পথে চালিত করে । যতক্ষণ না কবিমননে আলোড়িত ভাবনার মুক্তি ঘটে ততক্ষণ কবিরও রেহাই নেই । প্রকাশের অবর্ণনীয় আনন্দ কবিকে দেয় প্রজাপতির সৃষ্টির স্বাদ । মনন-প্রতিচ্ছায়া সৃষ্টির এই প্রয়াস জন্মান্তরের এক অনন্য উপলব্ধি । কিন্তু কবিহৃদয় শুধু তৃপ্ত হয় না । সৃষ্টির স্বরূপ উদ্ভাসেও তিনি সমান যত্নবান । ' মা নিষাদ প্রতিষ্টাং ' উচ্চারণেই আদিকবির ক্রৌঞ্চবিরহের শোকাবেগ পরিতৃপ্তি লাভ করেনা । এরপরেও তাঁকে এই পাদবন্ধের স্বরূপ সম্পর্কে ভাবতে হয় । এভাবেই জন্ম হয় ' শ্লোক '-এর --শোকার্ত হৃদয়-আর্তির । শ্লোক ছন্দের তন্ত্রীতে আন্দোলিত কবিতারই প্রাচীন নাম । কবিমানসের পক্ষে ভাবযন্ত্রনা উপেক্ষা করা অসম্ভব । প্রকাশের যন্ত্রনাই তাঁর জীবনে আনে প্রকাশের অসীম আনন্দ -- দান করে মুক্তি । কাব্য সৃষ্টি লগ্নের এই যন্ত্রনা ' রক্তকে কালিতে রূপান্তরের যন্ত্রনা ' । এই যন্ত্রনার জন্ম আত্মার অতল গভীরে -- মরমী আবেগে । আত্মাভিমানের খোঁজে সৃষ্টির মহত্বে । শব্দ, চিন্তা আর বাক্যের অস্থি নিয়ে কবির আবেগ থেকে ভূমিষ্ট হয় কাব্যশরীর । তার থাকেনা কোনো ব্যাক্তিপরিচয় । নিজের অস্তিত্ত্বের উর্ধ্বে সর্বজনীনপরিচয়ই এর লক্ষ্য । কবিতার এই সার্বিক ব্যঞ্জনা সেই মহাকাব্যের যুগ থেকে কবিকে দিয়ে এসেছে নবজাতের সম্মান ।

কবির কাছে কবিতা ' সমস্ত জ্ঞানের শ্বাসপ্রশ্বাস আর সুক্ষ আত্মা ' । এই সুক্ষ আত্মার অবাধ সঞ্চরণেই কবিতা ঋদ্ধ হয়ে উঠে । এর অবারিত যাত্রা কবিকে এই বোধে পৌঁছে দেয় যে ' আমার জন্মের কোনো শেষ নেই ' । প্রতিটি নতুন কবিতার জন্ম কবিকে দেয় জন্মান্তরের আস্বাদ । এই আস্বাদ কবি অনুভূতির কাছে দাবী রাখে ' যেতে যেতে মনে রেখো পিছনে কী ছিল '। ভূত বর্তমান ভবিষ্যত ' প্রতিমুহূর্ত বাড়িয়ে দেয় হাত / সম্পর্কে আনন্দে দূর্বাজলে '।
কবির কাছে জীবনও ' দাবি করেছিল যেন প্রত্যেক মুহূর্তে তুমি কবি '। প্রত্যেক মুহূর্তে কবি হয়ে ওঠার দায়িত্ব কবিরা অস্বীকার করেন না । তাঁর ' না লেখা কবিতাগুলি' সবসময় তাঁকে ' সর্বাঙ্গ জড়িয়ে আদর করে ,চলে যায় ঘুরে ফিরে আসে ' । তিনি অনুভব করেন ' কবিতা লেখার চেয়ে কবিতা লিখবো লিখবো এই ভাবনা আরও প্রিয় লাগে ' । চোখে ' কবিতার সুখস্বপ্ন গাঢ় হয়ে আসে ' । তখন মেধা এসে ডেকে নিয়ে যায় কবিকে । কবিমুখে উচ্চারিত হয় সেই ধ্রুব স্বীকারোক্তি :

" কবিতার সত্যে আমি একঝলক মিথ্যের বাতাস
লাগাই , কী পালটে যায় কবিতার সত্য একদিনে
তাহলে সত্যের নেই সেই বুঝ , সেই দাঁড়সাঁতার ,
সত্য নয় শিশু , নয় রাজনীতি , নয় মুথা ঘাস । "

এই ' মিথ্যের বাতাস ' কবির রৌদ্র রূপালি হৃদয়ে প্রশ্ন রাখে ' কবিতার সার কথা নাকি সত্য , অথচ কবিরা সব মিথ্যুকের একশেষ নয়?' কবি সমাজের আত্মা নন । তিনি সেই ' sooth sayer ' এর ভূমিকাও পালন করেন না যে জুলিয়াস সিজারকে বলেছিল তাঁর দিন ফুরিয়ে এসেছে । কবির সত্য সমাজের দিগদর্শনের জন্যও সৃষ্টি হয় না। বাস্তবকে তিনি গ্রহণ করেন নিজের মত করে । কবি জানেন কবিতার আবেদন বুদ্ধি মেধা বা জ্ঞানের কাছে নয় -- এর আবেদন হৃদয়ের গহীনে । জীবনের মানুষের সংসারের প্রকৃতিজাত সারসত্যকে তিনি উদ্ভাসিত করে তোলেন তার একান্ত নিজস্ব বিশ্বাসের আলোকে । কবির বিশ্বাস বাস্তব সবসময় সত্যকে অনুসরণ নাও করতে পারে । ' কবিরা সবসময় সত্যদ্রষ্টা হয় না ' -- এই স্বীকারোক্তিকে সামনে রেখেই সুক্ষ্ম আত্মার বিচরণের অভিজ্ঞতায় কবি কাব্যসত্যকে রচনা করেন । তাঁর একটাই আশা , ' শব্দ তার প্রতিবিম্ব আমাকে দেখাবে বলেছিল '। এই প্রত্যয় নিয়েই চলে কবিতার সঙ্গে কবির নিত্য ঘরকন্না , জন্ম হয় নতুন নতুন কবিতার । এই প্রতিটি নতুন কবিতার মধ্যে অর্ন্তলীন থেকে যায় একটাই সত্য -- কবি যাকে খোঁজেন সারাজীবন ধরে । জন্ম হয় নতুন নতুন কবিতার । কবিমন উপলব্ধি করে :

' একটাই তো কবিতা
লিখতে হবে , লিখে যাচ্ছি সারা জীবন ধরে । '

আজীবন এই একটা কবিতার অনুশীলন করেই কবির পথচলা । এই পথচলা জীবনসত্যে উত্তরণের জন্য । এই সত্য কবিজীবনে এনে দেয় অলৌকিক আস্বাদ । সৃষ্টির অতৃপ্তি থেকে সৃষ্ট হয় প্রতিটি নতুন কবিতার । বাস্তব পরিপার্শ্ব তাঁর হৃদয়ে জাগায় তীব্র আলোড়ন । অন্য সব মানসিক কষ্ট থেকেও এই যন্ত্রনা দুঃসহ হয়ে উঠে । মননের আয়ু ঝড়িয়ে যতক্ষন না এই কষ্টকে কবি হৃদয় করতে নিংড়ে প্রকাশ করতে পারেন ততক্ষন তা কবিকে কুরে কুরে খায় । কিন্তু একবার তা কবিতাকারে প্রকাশ হয়ে যাবার পর এক অনিবর্চনীয় আনন্দ্রসে ডুবে যায় কবিমন । আত্মিক যন্ত্রনার পরিণাম এই সৃষ্টি কবিকে দেয় এক অনন্য অনুভূতি । যন্ত্রনার এই জন্মান্তরের আস্বাদ থেকেই কবি বারবার আশ্রয় খোঁজেন কবিতার ওমে । সৃষ্টির এই আতৃপ্তি কখনও পূর্ণ হবার নয় । অতৃপ্ত এই অনুভূতির অভাবে মৃত্যু ঘটে সৃষ্টির -- মৃত্যু হয় কবির । জীবনের আকাঙ্খায় কবিকে কবিতা সৃষ্টি করটি হয় । এভাবেই জন্ম হতে থাকে কবিতার -- কবির ঘটতে থাকে জন্মান্তর ।


( এই আলোচনায় ওয়ার্ডসওয়ার্থ , এলিয়ট , শক্তি চট্টোপাধ্যায় , শঙ্খ ঘোষ , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং জয় গোস্বামীর কবিতার অংশবিশেষ ব্যবহৃত হয়েছে । )